
মনের ভাব প্রকাশে আমি বরাবরই অক্ষম,তা তুমি ভালো করেই জানো। অথচ সে দিন কাশবনে লাল ফ্রকের এক বালিকার উচ্ছাসিত হাসির যে পবিত্রতা দেখেছিলাম তা তোমাকে বোঝাতেই পারি নি।
তুমি হেসেছিলে খুব। আসলে ওই হাসির পবিত্রতাটাই সত্য, তোমার আমার ক্যাফেতে বসে থাকায় তা নেই। হয়তো,হয়তো তোমার চোখের কৃত্রিম কাজল রেখাতেও নেই, নেই আমার শব্দের উপস্থাপনায়
জড়িয়ে রাখার চেষ্টাতেও।
আমার স্মৃতিময় শহর; আমার স্বপ্নালু চোখে এঁকে দিয়ে গেছে কত শত স্বপ্নের আঁকিবুঁকি।
কত কত পাওয়া, না পাওয়ার উপকাহিনী। বহুকাল ধরে ঐ চিলেকোঠার ধুলোজমা দেরাজে পড়ে আছে ছেঁড়া ঘুড়ি, নাটাইয়ের জীর্ণ সুতো। সেখানে এখনো স্বেচ্ছায় বন্দী আমার কৈশোর।
তাকে তবে সেখানেই থাকতে দাও। শাদা-শরত আকাশের নিচে, ছাদের রেলিং ধরে হাঁটতে হাঁটতে
বেড়ে উঠেছে আমার চিন্তারা। হয়তো সেখানে এখনো হাঁটছে তারা, কোন এক চৈতালি ভরা জোছনায়।
নিঃসঙ্গ রাখালের বাঁশির মতো গুমরে গুমরে কাঁদছে আমার ফেলে আসা ভালোবাসা, বাতাসে উড়তে থাকা তার চুল, গোলাপি ওড়না। উদাসী বিকেল আর হিরণ্ময় দুপুরের মায়ায় বাকিটা জীবন সেখানেই থাকুক তারা। বিশ্বদা’র দোকানে এখনো লুকিয়ে আছে আমার স্কুল ফাঁকির ঘণ্টাগুলো, সিগারেটের ফিল্টারে প্রথম টান, লাল চোখ আর দমকা কাশি। অপরাধী’র মতন মুখ করে সেখানেই লুকিয়ে থাকতে চায় তারা। তবে তারা সেখানেই থাকুক, তারপর নিমেষেই ভুলে যাক আর সব। সিক্ত নীলাম্বরীর মতো ভিজে সারা হোক অঝোর শ্রাবণে।
জানিনা কতটুকু সময় পার হলে অপেক্ষা খুব ভারী মনে হয়। দুচোখের পাতায় নেমে আসে ভোরের শিশির। ভালোলাগা,ভালোবাসা শব্দগুলোর কাছাকাছি যতগুলো আপন শব্দাবলী তোমাকে দেবার কথা ছিলো , সবগুলো জমিয়ে রাখি। কে জানে যদি আর না আসো যদি জীবনের একটু দেখা হওয়া আলো হয়ে জুড়ে থাকে মনের আকাশ। যদি তুমি আমার আকাশ সীমায় মেঘ হয়ে আসো খুব, বৃষ্টি হয়ে ঝরো একদিন। আমি না হয় সেই বৃষ্টিতে ভিজে হবো স্নিগ্ধ সকাল।
বৈশাখের দিন গুলোতে যখন শুনশান দুপুরগুলো দীর্ঘ হতে থাকে কেবলি ধূসর হতে থাকি। তোমার বাড়ীর ছাদ থেকে আমার আঙিনা । এক্কা দোক্কা খেলা। বাতাবী লেবুর গাছটার ছায়ায়। দুপুরের আকাশ দেখার ফাঁকে কখনো? চোখ কি আমাতে ছিলো? কে জানে বাতাবী লেবুর গন্ধ মেখে কখনো কি আমি ও তোমার দিকে?
এই বৈশাখে তোমাকে যদি কাছে পাই। খুব কাছে পাই একদিন, মনে ভাবি। এখনো সেই গন্ধময়্তা জুড়ে থাকে। শুধু অস্পষ্ট তোমার চোখ, দেখা হলো না কোনদিন। এভাবে পিছন ফিরে থাকো যদি
আকাশের দীর্ঘ মেঘের পথ হয়ে।
কখনো পাওয়া হবেনা সেই তারাকে যার খুব কাছে বসবাস ছিলো একদিন। বৈশাখ এলে এইকথাটা ভাবনার ঘুঘু হয়ে ডাকতে থাকে সকাল দুপুর রাত।
কান্না পাচ্ছে? কাঁদো, মন ভরে কাঁদো, কালো মেঘের চেয়ে বৃষ্টি ভালো। জৈষ্ঠের খাঁ খাঁ মাঠে বৃষ্টি র বড় দরকার। কাঁদো, সময় এখন ডুকরে ওঠা কান্নার। জানি বিচিত্র ফসল ফলে তোমার নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে। সাধনার জমিজমা তোমার, বহু প্রানের জীবিকা। তোমার সচ্ছলতার পলপুঞ্জে পড়ে বাজারির চোখ, দামাদামি করে শুধু তারা, মায়া বোঝেনা। তবুও তোমার পুঁজির লোভ, নাও দরদামে হেরে যাও অভিঞ্জ বাজারির কাছে। এইসব দরদাম, হারজিত ভুলে যাওয়া সহজ, তবু মৌসুমী শেষে জৈষ্ঠের শূন্য মাঠ দেখে যদি ভর করে পুরোনো দিনের কোনো আবেগ, যদি পুরো আকাশ কালো হয় মেঘে মেঘে
জানি, ভীষন কান্না পাবে তোমার,
তুমি কাঁদবে।
মানুষের অদ্ভুত অদ্ভুত সব ভাল লাগা থাকে। আমারও এমন একটা আছে, বলা ভাল ছিল। আমার অদ্ভুত ভাল লাগা হল কাশির শব্দ শুনে সেটা নকল করা।
চিরকাল সরস্বতীই প্রিয় আমার, পছন্দ তনুজা, পছন্দ সুচিত্রা মিত্র। তবু কোজাগরী চাঁদ যখন সুখে ভেসে থাকে আমাদের পুরনো দীঘিটার বুকের উপর তখন তাকে হারিয়ে যাওয়া মেয়েটির মতো লাগে, সেও তো এমনই করে বুকের সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসতো ছাদে। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে প্রতারিত হওয়ার জন্য যখন প্রস্তুত করি সততাকে তখন মাথার মধ্যে কে জানে কেউ বলে- ‘কি দরকার? ঘরে বসে থাকো, কবিতা লেখো। বলে, মানব সভ্যতার ইতিহাস আসলে প্রতারণার ইতিহাস’।

কিছু ঘটনা আমাদের অজান্তেই আমাদের হঠাৎ আলতো করে নাড়িয়ে দিয়ে যায়, বুঝতে পারি জীবনটা বড্ড বেশি ক্ষনস্থায়ী, আঙুলের ফাঁকগলে কখন যে সোনালী মুহুর্তগুলো উড়ে গেলো…
আজকাল কোনো কারন ছাড়াই বড্ড মন খারাপ করে, মনকেমনের পাখিরা ভীড় করে আছে পুরো আকাশ জুড়ে। যখন মনখারাপের মেঘগুলো নদীর দুকুল ছাপিয়ে যায়, তখন তোর কথা বড় বেশিই মনে পড়ে। খুব ইচ্ছে করে তোর কাছে ফিরে যাই।
নিজের ভেতরেই আছে অলৌকিক। কখনও কখনও তাকে টের পাওয়া যায়। তাই তুমি একবার স্বপ্নে এক জনহীন প্রান্তুরে দাঁড়িয়ে এক নীল অতি সুন্দর বর্নের উড়ন্ত সিংহকে তোমার নিকটবর্তী হতে দেখে ভয় পেয়েছিলে। অথচ ভয়ের কোনো কারন ছিল না, কেন না সেই সিংহের নীল কেশর, নীল চোখ ও নীল নখ সবই হিংস্রতা শূন্য ছিল। এবং সেই নীলবর্নের সিংহের বাসস্থান ছিল না বলে সে অতি নম্র ভাবে তোমার সামনের ভূমি স্পর্শ করে তোমার কাছে একটি বাসস্থানের সন্ধান জানতে চায়, কেননা তুমি এই পৃথিবীর আইনসম্মত বসবাসকারী।
শীতের শেষে বসন্তের গোড়ার দিক, তখন বাতাসে টান লেগেছে। শুকনো পাতারা টুপটাপ করে ঝরে শেষ হয়েছে। খেতে মটর শাকে পাক ধরেছে। যারা শুকনো কাঠ-পাতা কুড়োতে যেত তাদের দিন গেল।

ন
অনিমেষ যথেষ্ট কাজের ছেলে ছিল। বিষয়ী লোক, টাকা-পয়সার হিসেব ভালো বুঝত। ভাসানের সময় যখন সবাই সিদ্ধি খেয়ে নাচতে ব্যস্ত তখন লাইটিং-এর ভ্যান-রিক্সা ঠিক-ঠাক রাস্তা পার করানো, ট্র্যাফিক সামলানো এসবে তার আগ্রহ ও নিষ্ঠা দুটোই ছিল দেখার মত। ক্লাবের পিকনিকে মাতাল বন্ধুদের সে দায়িত্ব সহকারে বমি করাত, সামনে প্লাস্টিকের বালতি ধরত। পাড়ার ফাংশানে আর্টিস্টদের জন্য টিফিনের প্যাকেট থেকে শুরু করে ২৬শে জানুয়ারীর পতাকা-ফুলের দরদাম, অনিমেষ ছাড়া গতি ছিল না। তাই ও গাড়ী চাপা পড়ার পর আমাদের ফাইভ-এ-সাইড ফুটবল টুর্নামেন্ট ওর নামে করতে আমাদের বেশি ভাবতে হয়নি। তাছাড়া আমি হিসেব করে দেখেছিলাম ৭ নম্বর স্ট্রীটের গোপালের বাবার গায়ে আগুন লাগানোর পর অনিমেষই ছিল ফার্স্ট কেস। তার পরেও এ তল্লাটে আর কেউ অমন অপঘাতে মরেনি। সেই ৮৮’ সালেও অনিমেষের কালার ফোটো তোলানো ছিল। অতসীর জন্য। সেটা আমিই ফ্রেমে বাঁধিয়েছিলাম। চার পেয়ে কাঠের টেবিলে ফুলের মালা পরে হাসিমুখে বসে থাকে অনিমেষ প্রতি ১৫ই আগস্ট, কপালে চন্দনের ফোঁটা। ৬ বছর হয়ে গেল। এই ভাবে দুটো ওয়ার্ল্ড কাপ পার করে দিল। কে আবার ওর নামের সাথে ‘শহীদ’ জুড়ে দেওয়ায় রমরমা হয়ে যায়। ফ্রেম বাঁধানোর টাকাটা আমি অভ্যেসবশত মেরে দিয়েছিলাম। ওটা নিছকই রিফ্লেক্স। অনিমেষ ভালো বন্ধু ছিল আমার। আমি অতসীদের ভাড়াটে, আমাকে ছাড়া ওর চলত না। অতসীকে চিঠিও আমাকেই লিখতে হত। চিঠি হাত বদলও আমিই করে এসেছি বরাবর। তবে অনিমেষের মৃত্যুর খবর আমি অতসীকে দিতে পারিনি। আমি তখন দোকানে বসে। পল্টু সবার আগে অতসীর বাবাকেই খবরটা দেয়। এই একটাই সুযোগ ও পেয়েছিল অতসীদের বাড়ী ঢোকার। ওকে দোষ দিই না। আমারই কপাল খারাপ। অতসী নাকি বড়জোর সাড়ে চার সেকেন্ড হতভম্ব থেকেই কাঁদা শুরু করেছিল। পল্টুর মতে সিনেমার সাথে কিছুই মেলেনি। সিঁড়িতে ধপ করে বসেও পড়েনি অতসী। অজ্ঞান হতে হতে সন্ধ্যে হয়ে গেছিল। আমি তার বছর দুই আগে পাড়ায় আসি। আমার দোকান। অতসীর প্রেম সেবার পূজোয়। ১৯৮৮ সাল।
আমার শহরখানি, বিষন্ন ভরা ল্যাম্পোস্ট, 
কেমন আছো তুমি আমার লেখার ঘর, কেমন আছ তুমি পুকুর, খোলা মাঠ, ফিরবই।
১.